যাকাত
যাকাত শব্দটার অর্থ পবিত্রতা আর বৃদ্ধি। এটাও ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। যাদের সম্পদ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ, মানে নিসাব ছাড়িয়ে যায় এবং সেটা এক বছর ধরে থেকে যায়, তাদের ওপর সেই সম্পদের একটা অংশ, সাধারণত আড়াই শতাংশ, গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা ফরজ হয়ে যায়। এটা কোনো স্বেচ্ছায় করা দান না, বরং একটা বাধ্যতামূলক বিধান, যা সম্পদশালী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকে যাকাত আর সাধারণ দানকে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু দুটোর মধ্যে একটা স্পষ্ট পার্থক্য আছে। দান স্বেচ্ছায় করা যায়, যেকোনো সময় যেকোনো পরিমাণে, কিন্তু যাকাতের একটা নির্দিষ্ট হিসাব আছে, নির্দিষ্ট সময় আছে, আর এটা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই যদি কারো ওপর ফরজ হয়ে থাকে।

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদের আসল মালিক আল্লাহ, মানুষ শুধু সেটার একজন আমানতদার মাত্র। যে সম্পদ আমরা অর্জন করি, তার মধ্যে গরিব মানুষদেরও একটা হক থাকে। যাকাতের মাধ্যমে সেই হকটাই আদায় করা হয়। এভাবে সমাজে সম্পদের প্রবাহ চালু থাকে, ধনীদের কাছে সম্পদ জমে থাকার সুযোগ কমে যায়। ফলে দারিদ্র্য কমাতে এবং সামাজিক বৈষম্য কমাতে যাকাতের একটা বড় ভূমিকা থেকে যায়। আধুনিক অর্থনীতিতেও দেখা যায়, সম্পদ যখন কিছু মানুষের হাতে জমে থাকে আর বাজারে ঘোরে না, তখন অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। যাকাত সেই সম্পদকে জোর করেই বাজারে ফিরিয়ে আনে, গরিবের হাতে পৌঁছে দেয়, আর তারা সেটা খরচ করে ফের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করে। আরও পড়ুন
নিসাব পরিমাণ সম্পদ, মানে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা তার সমমূল্যের সম্পদ যার কাছে এক বছর ধরে জমা থাকে, তার ওপরই যাকাত ফরজ হয়। নগদ টাকা, ব্যবসার পণ্য, সোনা-রুপা, শেয়ার — এসবের ওপর যাকাত দিতে হয়। তবে নিজের বসতবাড়ি বা ব্যবহারের গাড়ির মতো ব্যক্তিগত জিনিসের ওপর যাকাত প্রযোজ্য হয় না। কৃষি ফসল, গবাদি পশু আর খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও যাকাতের আলাদা কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো সাধারণ নগদ সম্পদের হিসাবের চেয়ে একটু ভিন্ন। এই জন্য যাদের ব্যবসা বা কৃষিকাজ আছে, তাদের উচিত নিজের সম্পদের ধরন অনুযায়ী সঠিক নিয়মটা জেনে নেওয়া, যাতে হিসাবে ভুল না হয়।
নিসাব পরিমাণ সম্পদ, মানে সাড়ে সাত ভরি সোনা বা তার সমমূল্যের সম্পদ যার কাছে এক বছর ধরে জমা থাকে, তার ওপরই যাকাত ফরজ হয়। নগদ টাকা, ব্যবসার পণ্য, সোনা-রুপা, শেয়ার — এসবের ওপর যাকাত দিতে হয়। তবে নিজের বসতবাড়ি বা ব্যবহারের গাড়ির মতো ব্যক্তিগত জিনিসের ওপর যাকাত প্রযোজ্য হয় না। কৃষি ফসল, গবাদি পশু আর খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও যাকাতের আলাদা কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো সাধারণ নগদ সম্পদের হিসাবের চেয়ে একটু ভিন্ন। এই জন্য যাদের ব্যবসা বা কৃষিকাজ আছে, তাদের উচিত নিজের সম্পদের ধরন অনুযায়ী সঠিক নিয়মটা জেনে নেওয়া, যাতে হিসাবে ভুল না হয়। আরও জানুন
কোরআনে সরাসরি আটটি খাতের কথা বলা আছে যেখানে যাকাতের টাকা খরচ করা যায়। ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, নওমুসলিম, ঋণগ্রস্ত মানুষ, আল্লাহর পথে ব্যয়, মুসাফির এবং দাসমুক্তি। তবে এখনকার সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হলো গরিব-দুঃখী, এতিম, বিধবা আর অভাবী পরিবারগুলোকে যাকাত দেওয়া। যাকাত নিজের বাবা-মা, সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীকে দেওয়া যায় না, কারণ তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এমনিতেই নিজের ওপর বর্তায়। তবে ভাই-বোন, চাচা-মামা বা অন্য আত্মীয় যদি অভাবী হন, তাদের যাকাত দেওয়া যায়, বরং এতে সওয়াব দ্বিগুণ হয় বলে হাদিসে এসেছে, কারণ এতে যাকাতও আদায় হয় আর আত্মীয়তার হকও রক্ষা হয়।
অনেকে মনে করেন যাকাত দিলে বুঝি গরিবের জন্য একটা বড় উপকার করা হচ্ছে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যাপারটা আসলে উল্টো। যাকাত হলো গরিবের হক, যেটা ধনীর কাছ থেকে আদায় করে নেওয়া হচ্ছে মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা মাথায় থাকলে যাকাত দেওয়ার মানসিকতাটাও বদলে যায়। তখন এটা আর করুণা থাকে না, বরং একটা দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। যাকাত দেওয়ার সময় তাই গ্রহীতাকে ছোট করে দেখা বা অপমান করার কোনো সুযোগ নেই, বরং সম্মানের সাথে, নীরবে এটা পৌঁছে দেওয়াটাই উত্তম।
যাকাত ফরজ হওয়ার পরও কেউ যদি সেটা আদায় না করে, তাহলে সেটা বড় গুনাহ হিসেবে গণ্য হয়। কোরআন আর হাদিসে যাকাত অস্বীকারকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবাণী আছে। শুধু পরকালীন শাস্তির কথাই না, দুনিয়াতেও এর প্রভাব পড়ে, সমাজে বৈষম্য বাড়তে থাকে, গরিবরা আরও অসহায় হয়ে পড়ে। খলিফা আবু বকর রাদিআল্লাহু আনহুর সময়ে যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পর্যন্ত করা হয়েছিল, যা থেকে বোঝা যায় ইসলামে যাকাতের বিষয়টা কতটা গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। আরও পড়ূন
একটা সমাজে যদি সবাই ঠিকমতো যাকাত আদায় করে, তাহলে সেই সমাজে দারিদ্র্য অনেকটাই কমে যাওয়ার কথা। ইতিহাসে দেখা যায়, খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজের শাসনামলে যাকাত এতটাই সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করা হয়েছিল যে যাকাত নেওয়ার মতো মানুষই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এই একটা উদাহরণই বুঝিয়ে দেয়, যাকাত ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটা কতটা শক্তিশালী একটা ব্যবস্থা হতে পারে। বর্তমান সময়েও অনেক দেশে সরকারিভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের ব্যবস্থা আছে, যেটা সঠিকভাবে চালানো গেলে দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যাকাত তাই শুধু একটা ইবাদত না, এটা একটা সামাজিক দায়িত্বও বটে। যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের উচিত সঠিকভাবে হিসাব করে সময়মতো যাকাত আদায় করা। এতে যেমন নিজের সম্পদ পবিত্র হয়, তেমনি সমাজের অসহায় মানুষগুলোও একটু স্বস্তি পায়। যাকাত আসলে দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক না, এটা একটা ভারসাম্য তৈরির ব্যবস্থা, যেখানে ধনী-গরিব সবাই মিলেমিশে বাঁচার একটা পথ খুঁজে পায়।
